যে ছয় পদক্ষেপে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে চমক দেখালেন থালাপতি বিজয়
Posted on May 05, 2026 5.8K
তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে থালাপতি বিজয়ের দল তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম-টিভিকের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে চলা এবং ডিএমকে ও এআইএডিএমকে-র মতো প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোকে পেছনে ফেলে দেওয়া কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল বছরের পর বছর ধরে সুনিপুণভাবে সাজানো এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফসল।
ফ্যান ক্লাবকে জনকল্যাণমূলক কাঠামোয় রূপান্তর
বিজয়ের এই রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়েছিল ভক্তদের আবেগকে একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি তার বিশাল ভক্তকুলকে কেবল সিনেমা প্রচারের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে রক্তদান শিবির, ত্রাণকাজ এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার মতো জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত করেন। কোয়েম্বাটুরের মতো শহরগুলোতে এই ফ্যান ক্লাবগুলো কার্যত সেবা সংস্থায় পরিণত হয়েছিল, যা ভোটের অনেক আগে থেকেই সাধারণ মানুষের অন্দরমহলে বিজয়ের প্রতি এক গভীর আস্থার জায়গা তৈরি করে দেয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরীক্ষামূলক অংশগ্রহণ
২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় সরাসরি রাজনীতিতে না নেমেও তার ব্যবস্থার এক গোপন মহড়া দিয়েছিলেন। সে সময় ফ্যান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ে ১৬৯ জনের মধ্যে ১১৫ জনই জয়লাভ করেন। এই অভাবনীয় সাফল্য প্রমাণ করেছিল যে, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতীক ছাড়াও তার কর্মীরা বুথ ব্যবস্থাপনা এবং ভোটারদের প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখেন।
সাংগঠনিক কাঠামোয় পেশাদারত্ব ও ফিল্টারিং
২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে বিজয় এরপর তার সংগঠনে করপোরেট ঘরানার পেশাদারত্ব নিয়ে আসেন। কেবল উৎসাহী ভক্ত হলেই চলবে না, বরং সাক্ষাৎকার এবং ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বা অতীত ইতিহাস যাচাইয়ের মাধ্যমে ওয়ার্ড ইনচার্জ ও বুথ এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। এর ফলে দলটির মধ্যে আবেগের পাশাপাশি এক কঠোর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরে আসে।
প্রতীকের প্রতীকী ব্যবহার ও উদ্ভাবনী প্রচারণা
প্রচারণার ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক ‘শিস’ (Whistle) ব্যবহারের কৌশলটি ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। এটি দ্রুত মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তৃণমূল স্তরের কর্মীরা নারীদের মাধ্যমে বাড়ির সামনে শিস আকৃতির আলপনা বা ‘কোলাম’ আঁকানোর ব্যবস্থা করেন। যা অনলাইন ও অফলাইন—উভয় মাধ্যমেই এক প্রবল ঝড়ের সৃষ্টি করে।
দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্কের সক্রিয়করণ
এই পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে বছরের পর বছর ধরে সচল থাকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোর মাধ্যমে, যেখানে প্রচারণার প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয় সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে যেত। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং যুবসমাজের কল্যাণের বার্তা নিয়ে কর্মীরা দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে গেছেন এমন এক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, যা আগে থেকেই সুগঠিত ছিল।
‘অনিল’ বা কাঠবিড়ালি পরিচয়ে জনশক্তি সংহত করা
এই পুরো রাজনৈতিক লড়াইয়ের পেছনে কাজ করেছে সমর্থকদের এক বিশেষ পরিচয়, যা তামিল রাজনীতিতে ‘অনিল’ বা কাঠবিড়ালি নামে পরিচিত। ২০১১ সালের নির্বাচনে বিজয় যখন জয়ললিতার জোটকে সমর্থন করেছিলেন, তখন রামায়ণের সেই কাঠবিড়ালির উপমা টেনেছিলেন যারা সেতু তৈরিতে শ্রীরামকে সাহায্য করেছিল। বিরোধীরা এই নামটিকে ব্যঙ্গ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি বিজয়ের সমর্থকদের একটি গর্বের পরিচয়ে পরিণত হয়। ছোট ছোট কন্ট্রিবিউটররা একত্রিত হয়ে কীভাবে এক বিশাল জয়ের সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে, বিজয়ের ‘অনিল’ বাহিনী আজ তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় আরোহনের মাধ্যমে তা হাতেনাতে প্রমাণ করে দিয়েছে।
কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক পথ অনুসরণ না করে ধাপে ধাপে গড়ে তোলা এই অভূতপূর্ব রণকৌশলই আজ বিজয়ের টিভিকে-কে চেন্নাইয়ের মসনদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
