ভোট কেন্দ্রের ৪১ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ

Posted on January 26, 2026   7K

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে পুলিশ সারা দেশে ভোট কেন্দ্রভিত্তিক নিরাপত্তাঝুঁকি চিহ্নিত করেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪২ হাজার ৭৬১ ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ১৭ হাজার ৫৫৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা মোট কেন্দ্রের প্রায় ৪১ শতাংশ। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ২ হাজার ১৩১ কেন্দ্রের মধ্যে ৬৯৫টি অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ অতি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ৮৫ শতাংশের বেশি কেন্দ্র কোনো না কোনো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

তবে নিরাপত্তার জন্য অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দুজন এবং সাধারণ কেন্দ্রে একজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। বডি-অন ক্যামেরায় ধারণকৃত দৃশ্য দেখে নেওয়া হবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। অন্যদিকে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ে রাখা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া। ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ভোটপূর্ব, ভোটের দিন এবং ভোট-পরবর্তী তিন ধাপের পৃথক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রগুলোর অবস্থান ও ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘রাজধানীর প্রতিটি ওয়ার্ডে কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হবে। ভোট কেন্দ্র থেকে কোনো সমস্যার খবর এলে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বাড়তি বাহিনী পাঠানো হবে। নিরাপত্তায় দায়িত্বরত অন্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্বাচনকেন্দ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ।’

প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা : পুলিশ জানিয়েছে, যেসব কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, সহিংসতা বা ভোট কারচুপির আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যরা বডি-অন ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক ভিডিও ধারণ করবেন। কোনো অনিয়ম বা সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হলে সেই ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগেই অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে ডিএমপির অর্থায়নে বসানো হচ্ছে আরও ৬০০ ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি)। তবে নির্বাচন কমিশন থেকে আরও সিসি ক্যামেরা দেওয়া হবে। এগুলোও স্থাপন করা হবে নগরীর নিরাপত্তায়।

স্তরবিন্যাস, পুলিশ মোতায়েন : পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে তিনজন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে দুজন এবং সাধারণ কেন্দ্রে একজন করে পুলিশ সদস্য স্থায়ীভাবে মোতায়েন থাকবেন। এর বাইরে মোবাইল টহল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হবে, যারা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত যেকোনো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারবে। ঢাকায় নির্বাচনি নিরাপত্তায় আলাদা সমন্বয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ। অন্য সব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কেন্দ্র থেকে রিয়েল টাইমে সব ভোট কেন্দ্রের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজনে জরুরি নির্দেশনা দেওয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রায় অর্ধেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া, ২০১৮ সালের নির্বাচনে ‘মধ্যরাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এসব ঘটনা দেশের নির্বাচনব্যবস্থার ওপর জনমনে গভীর অবিশ্বাস তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার পুলিশ যাতে কোনো দল বা প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে সে লক্ষ্যে একাধিক কাঠামোগত উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

ইতোমধ্যে লটারির মাধ্যমে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই প্রক্রিয়ায় দেশের সব থানার ওসিদের রদবদল করা হয়েছে। সূত্র আরও বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। গত তিন মাসে সারা দেশে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪০ হাজারের বেশি গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে চলমান রয়েছে অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২, যার লক্ষ্য অপরাধী চক্র এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। এ অভিযানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন জেলায় ৫০০ জনের বেশি তালিকাভুক্ত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, নির্বাচন পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি নির্বাচনের সময় করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্যকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সবকিছু নির্ভর করে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর। পরাজিত পলাতক শক্তি খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না। তবে প্রস্তুতি যতই থাকুক, শেষ পর্যন্ত বাস্তব পরীক্ষা হবে ভোটের দিন। প্রযুক্তি এবং পুলিশের সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি সবার শ্রদ্ধা।’

অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘অতীতে যেসব চ্যালেঞ্জ দেখা গেছে, সেগুলো যেকোনো সময় সক্রিয় হতে পারে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র, মব প্রক্রিয়া এবং ভোট কেন্দ্র দখলের মানসিকতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। শুধু প্রযুক্তি আর পুলিশ মোতায়েন দিয়ে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমাজের সর্বস্তরে জবাবদিহির সংস্কৃতি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ছড়ানো এখন অত্যন্ত সহজ। একটি মিথ্যা ভিডিও বা বার্তা কয়েক মিনিটের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে। নির্বাচনের দিন এ ধরনের গুজব মোকাবিলায় আলাদা প্রস্তুতি থাকা দরকার।’ নির্বাচন কমিশন সূত্র জানান, ভোট কেন্দ্রের ভিতরে ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে। কোনো ধরনের সহিংসতা বা অনিয়ম হলে ম্যাজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।


Share on

Tags

(0) Comments

  • Nothing Found!

Add Comment