মার্কিন চাপেই কি মৃত্যু হলো ভারতের চাবাহার স্বপ্নের?

Posted on April 29, 2026   6.9K

ইরানের চাবাহার বন্দর ঘিরে ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এখন অনিশ্চয়তার মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিলতার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি কার্যত অচলাবস্থায় পড়তে পারে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতির অংশ হিসেবে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ চাবাহার বন্দর

দক্ষিণ-পূর্ব ইরানে, ওমান উপসাগরের তীরে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার। এতে দুটি টার্মিনাল রয়েছে- শাহিদ কালান্তারি ও শাহিদ বেহেশতি, যার মধ্যে দ্বিতীয়টির উন্নয়নে ভারত প্রায় ১২ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

এই বন্দর ভারতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাকিস্তানের কারণে স্থলপথে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব নয়। চাবাহারের মাধ্যমে সমুদ্রপথে ইরানে গিয়ে সড়ক ও রেলপথে এসব অঞ্চলে পৌঁছানো সম্ভব।

গোয়াদরের পাল্টা ভারসাম্য

চীনের সহায়তায় ২০১৬ সালে পাকিস্তান তার গোয়াদর বন্দরের উদ্বোধন করে। এটি একটি গভীর সমুদ্র বন্দর, যা ভারতের জন্য কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এর জবাব হিসেবেই চাবাহারকে বিকল্প হিসেবে দেখে ভারত, যা গোয়াদর থেকে মাত্র ১৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

এছাড়া চাবাহার আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডর (আইএনএসটিসি)-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা রাশিয়া, ইরান ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সংযোগ তৈরি করে।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব

২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির পর কিছু সময়ের জন্য প্রকল্পে গতি এলেও ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে গিয়ে আবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে অগ্রগতি থমকে যায়।

যদিও প্রথমে চাবাহার প্রকল্পকে নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছিল, ২০২৫ সালে সেই ছাড় বাতিল করা হয়। ভারতের চেষ্টায় এই ছাড় ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাড়ানো হলেও এখন তা শেষ হয়ে গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে চলমান আঞ্চলিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এদিকে, ভারতের বার্ষিক বাজেটে এবার চাবাহার প্রকল্পে কোনও বরাদ্দ রাখা হয়নি- যা গত এক দশকে প্রথম। এতে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ভারতের সামনে বিকল্প কী

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের বিকল্প খুব সীমিত। যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকলে প্রকল্পে এগোনো কঠিন।

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, ভারত হয়তো সাময়িকভাবে নিজেদের অংশীদারিত্ব ইরানি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে আবার ফিরে আসা যায়।

অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে ভারত হয়তো ক্ষতি মেনে নিয়ে প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়াতেও বাধ্য হতে পারে।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, চাবাহার এখন ভারতের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে’ পরিণত হয়েছে। তবে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবারও এই প্রকল্পে ফিরে আসার সুযোগ থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, চাবাহার বন্দর নিয়ে ভারতের কৌশল এখন এক কঠিন পরীক্ষার মুখে-যেখানে ভূরাজনীতি, অর্থনীতি ও কূটনীতি একসঙ্গে প্রভাব ফেলছে। 

Share on

Tags

(0) Comments

  • Nothing Found!

Add Comment