হাওড়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে তিন মাস সহায়তা
Posted on April 30, 2026 6.5K
প্রবল বর্ষণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে টানা তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, এর মধ্যে ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসনকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
গতকাল সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে সুনামগঞ্জ-৫ আসনের এমপি কলিম উদ্দিন আহমেদের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ মানবিক ও জরুরি পদক্ষেপের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন লিখিত ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, তিন দিন আগের আবহাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়ার পরপরই স্থানীয় প্রশাসনকে আগাম সতর্কতা ও প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলাম। বৃষ্টির কারণে যেসব কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে, তাদের সঠিকভাবে চিহ্নিত করে আগামী তিন মাস প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংসদ অধিবেশনে যোগদানের আগেই তিনি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর সঙ্গে এই সংকট মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণে কথা বলেছেন। এ ছাড়াও আরও কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তারেক রহমান। এর আগে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ের নোটিসের পরিপ্রেক্ষিতে একটি সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রবল বর্ষণে সব হাওড় তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা ধান কাটতে মাঠে লড়াই করছেন। এ বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, কৃষকদের বিষয়টি উদ্বেগের। তিন দিন আগে আবহাওয়া প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তিনি তিনটি জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যেন পূর্বাভাস অনুযায়ী বৃষ্টিপাত হলে ব্যবস্থা নেন।
রাজধানী হবে ‘ক্লিন’ ও ‘গ্রিন’ নগরী : সরকারি দলের এমপি মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, রাজধানী ঢাকাকে ‘ক্লিন’ ও ‘গ্রিন’ নগরী রূপে গড়ে তুলতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার রোড মিডিয়ান, সড়কদ্বীপ ও উন্মুক্ত স্থানগুলো সবুজায়নের লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। এই সিটি করপোরেশন কোরিয়াভিত্তিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রে রূপান্তর করার মাধ্যমে সব বর্জ্যকে ‘জিরো’ বর্জ্যতে রূপান্তর করার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত বিভিন্ন এলাকায় নগর বনায়ন (মিয়াওয়াকি ফরেস্ট) উন্মুক্ত মিডিয়ান জিরো সয়েল-সবুজে আবৃত করা হচ্ছে। সিটির আওতাধীন এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ বৃক্ষরোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মেট্রোরেলের নিচের খালি অংশ (মিরপুর ১২ নম্বর থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত) এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (আবদুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত) নিচের খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ করা হবে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ঢাকা শহরের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহর সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনতে হলে বছরে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এর প্রক্রিয়াগত ব্যয়সহ খরচ হবে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। আবার ২ কোটি ৭৫ লাখ কৃষককে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়া হবে। সেখানে ৭ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। এটি দেশের অর্থনীতিকে কতটুকু স্বনির্ভর করবে? এ অর্থ কি বর্তমানে চলা সামাজিক সুরক্ষা খাত থেকে কেটে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, নাকি নতুন করে এ খাতে টাকা দেওয়া হচ্ছে? সে ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ঘটার সম্ভাবনা আছে কি না, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে কি না?
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে ফ্যামিলি কার্ডের কথা জনগণকে বলেছিলাম নির্বাচনের আগে, সেই ফ্যামিলি কার্ডটি মানুষ গ্রহণ করেছে এবং আপনি (হাসনাত আবদুল্লাহ) নিজেও সাক্ষী। আপনার নির্বাচনি এলাকায় আপনাকেও নারীরা ঘিরে ধরেছিল ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার জন্য। আপনি উত্তরে বলেছেন, যে মুহূর্তে ফ্যামিলি কার্ড সরকার দেবে, আপনি চেষ্টা করবেন তাঁদের ডিস্ট্রিবিউট করার। পর্যায়ক্রমে ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। সবার তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের কেউ বলছেন জামা-কাপড় কিনবেন, কেউ বলছেন বাচ্চাদের জন্য বই কিনবেন। যে মানুষগুলো পাচ্ছেন, তারা ব্র্যান্ডের জিনিস ব্যবহার করেন না। তারা প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহার করেন। তাদের ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেশীয় কারখানায় তৈরি। ফ্যামিলি কার্ডের টাকা গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছড়াবে। এটা স্থানীয় শিল্পায়নে ভূমিকা রাখবে, কর্মসংস্থান বাড়াবে। তিনি বলেন, এটা (ফ্যামিলি কার্ড) রাষ্ট্রের একটা বিনিয়োগ, যার মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্থানীয় শিল্প গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থান গড়ে উঠবে। তাই আমাদের হিসাব হচ্ছে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না, বরং কমবে।
চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ : জলাবদ্ধতার কারণে কষ্টের শিকার হওয়ায় চট্টগ্রাম মহানগরের বাসিন্দাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব, এই সমস্যা থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে সরকার। এর আগে চট্টগ্রাম-১০ আসনের এমপি সাঈদ আল নোমান সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, অনেক বড় ওয়াটার লগ হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে একটু সময় লাগবে। এই কষ্টের জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে চট্টগ্রাম শহরে বসবাসকারী সব নাগরিকের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমরা চেষ্টা করছি, যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্যা থেকে মানুষকে যেন বের করে নিয়ে আসা যায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, গতকাল তিনিও সংবাদমাধ্যমে দেখেছেন চট্টগ্রাম শহরের একটি বড় অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। এই সমস্যা শুধু চট্টগ্রামে নয়, বলা যায় সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। ঢাকা শহরেও অনেক জায়গায় বৃষ্টিতে পানি জমে যাচ্ছে। এটি অনেক দিনের সমস্যা। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সমগ্র বাংলাদেশে খাল খননের মাধ্যমে রিজার্ভার তৈরি করেছিলেন, একই সঙ্গে বন্যা বা জলাবদ্ধতাও দূর করেছিলেন। একই কাজে আবার ফিরে যেতে হবে। বর্তমান সরকার সে কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানের কৃষিমন্ত্রীর সাক্ষাৎ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছে জাপানের কৃষিমন্ত্রী ও দেশটির সরকারের বিশেষ দূত সুজুকি নরিকাজুর নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। গতকাল বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য জাপান সরকারের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান তিনি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি দুই দেশের মধ্যে ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ দূত বাংলাদেশে জাপানি খাদ্যপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি এবং কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী জাপানে বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি খাতে দক্ষ জনবল পাঠানোর সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। জাপানি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর এসব প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে।
বৈঠকে জাপানের সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর, মেট্রোরেল প্রকল্প এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করার বিষয়ে জাপানি পক্ষ গুরুত্বারোপ করে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
জাপানি প্রতিনিধি দল রোহিঙ্গাসংকট মোকাবিলায় ১৭.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা দানের কথা জানায়। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ওপর জোর দেন। এ ছাড়া জাপানের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জাপান সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রধানমন্ত্রীও সুবিধাজনক সময়ে জাপানে সরকারি সফরের আশা ব্যক্ত করেন।
বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কৃষিবিষয়ক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর এবং বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি।
