Latest News

দোস্ত-দুশমন এক হয়ে যাওয়ার ঈদ

Posted on March 19, 2026   11.8K

ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে অনাবিল আনন্দ। সারা দিন উৎসব আর প্রিয়জনদের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্ত ভাগাভাগি করার নাম ঈদ। ধনী-গরিব, আমির-ফকির, রাজা-প্রজা সবার কাছে খুশির বার্তা নিয়ে হাজির হয় এই ঈদ।

বাঙালি মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব এটি। ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে ঈদগাহে ছুটে চলেন সিয়াম সাধকরা। ঈদের জামাতে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান মুমিন-মুত্তাকিরা। ভুলে যান সব ভেদাভেদ। চমৎকার এ দৃশ্য অক্ষরের ক্যানভাসে এঁকেছেন কবি ফররুখ আহমদ। ‘আজকে এলো খুশীর দিন/দেখ না চেয়ে খুশীর চিন/দেখ না চেয়ে আজ/রঙিন খুশীর ঝলক ঈদগাহে।’

ঈদের নামাজ শেষে একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করে প্রেমের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে তোলে। ভুলে যায় সব দুঃখ-ক্লেশ। একে অন্যকে দেওয়া যত কষ্ট আছে, দুঃখ আছে সব ঝেড়ে ফেলে কোলাকুলির মাধ্যমে। শত্রুকে বন্ধু আর বন্ধুকে ভাই করে নেওয়ার এমন শিক্ষাই দেয় ঈদ।

জাতীয় কবি লিখেছেন- ‘আজিকে এজিদে হাসেনে হোসেনে গলাগলি/দোজখে বেহেশতে সুর ও আগুনে ঢলাঢলি।’ ঈদের শিক্ষা বলতে গিয়ে কবি নজরুল আরও বলেন, ‘এ দিন শয়তান জান্নাতে শরাব বিলায় আর জাহান্নামের আগুন আনন্দে জ্বলতে থাকে। দোস্ত-দুশমন এক হয়ে যায়। শহর-গ্রামের প্রতিটি ঈদের মাঠ একেকটি আরাফার ময়দানে পরিণত হয়। রাজা-ফকির কোলাকুলি করে হয়ে যায় ভাই ভাই।’

সময়ের সঙ্গে সবকিছুর রুহানিয়াত হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে ঈদের কোলাকুলির শিক্ষাও। আজও মুসলমানরা ঈদের ময়দানে যায়। নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে কোলাকুলি করে। কিন্তু মনের ভিতর লুকিয়ে রাখে হিংসা, ক্লেদ, বিদ্বেষ, অহংকার। এক মায়ের পেটের দুই ভাই ঈদের নামাজ পড়তে যায়। কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। কেউ কারও মুখ দেখে না।

এমনকি পথে যেন দেখা না হয় অন্য পথ ঘুরে যায়। অথবা এক ভাই যে ময়দানে নামাজ পড়বে অন্য ভাই আরেক ময়দানে গিয়ে নামাজ পড়ে। বাবার বাড়ির সম্পত্তি নিয়েছে বলে বছরের পর বছর বোনের খোঁজখবর নেয় না। অথচ ঈদ আসলে রোজা আসলে বোন তাকিয়ে থাকে পথের দিকে। এই বুঝি ভাই আসল। সেমাই চিনি না আনুক। ভাই অন্তত আসুক। মায়ের পেটের ভাইয়ের চেয়ে আপন দুনিয়াতে আর কেউ হয় না। সে ভাই-বোনের খোঁজ নেয় না। ভাইয়ের মুখ দেখে না। সন্তান বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলে না। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে অবলীলায়। এই হলো আমাদের আজকের পুঁজিবাদী জাহেলি সমাজের হিংসায় ঘেরা ঈদ। হায়!

এখনো মুসলমানরা ঈদের নামাজ পড়ে কোলাকুলি করেন। কিন্তু কোলাকুলির যে মহান উদ্দেশ্য সে বিষয়ে নজর নেই কারওই। এমপি, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, চেয়ারম্যান, মেম্বারদের সঙ্গে কোলাকুলির ভিড় লেগে থাকে। কিন্তু গরিব-দুখীদের সঙ্গে কেউ কোলাকুলি করতে চায় না। কোলাকুলি সংস্কৃতিতেও লেগেছে রাজনীতির হাওয়া। কর্মীদের সঙ্গে নেতা বুক মিলিয়ে বোঝাতে চায় এ বুক তোমাদের দিয়ে দিলাম। তোমরা থেকো আমার সঙ্গে। আবার যারা অফিস-আদালতে চাকরি করেন, তারা বসের সঙ্গে কোলাকুলির জন্য বসে থাকেন। বসকে কোনোভাবে সন্তুষ্ট করতে পারলেই প্রমোশন নিশ্চিত। এভাবেই সাম্যের কোলাকুলি হয়ে পড়েছে আভিজাত্যের কোলাকুলি। কোলাকুলি এখন ভোটের, দলের, প্রমোশনের মাধ্যম পরিণত হয়েছে। তাই আজ আর কোলাকুলির মাধ্যমে শত্রুকে বন্ধু আর বন্ধুকে ভাই বানানো যায় না। আমাদের ঈদ সংস্কৃতিতে এই আভিজাত্যের কোলাকুলি মুছে ফেলতে হবে। যে কোলাকুলিতে প্রেম নেই, দরদ নেই এম কোলাকুলি তো কপটতা ছাড়া কিছুই নয়। কোলাকুলির নামে কীভাবে ঠকছি এবং ঠকাচ্ছি আমরা নিজেরাও বুঝতে পারি না।

আসলে ইসলাম শেখায় শান্তি ও সাম্য। মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই-ইসলামের এই মৌলিক শিক্ষা জাগিয়ে রাখতেই বছর ঘুরে ঈদ আসে। সবাই সবার সঙ্গে সাম্যের কোলাকুলি করে। আমরা যদি মন থেকে মানুষের সঙ্গে প্রেমের কোলাকুলি করতে পারি, তবে এ কোলাকুলি আমাদের মাঝে প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি করবে। আর যদি আমরা হিংসায় বুক ফিরিয়ে রাখি আর স্বার্থে বুক বাড়িয়ে দিই তাহলে ঈদ আমাদের জন্য বয়ে আনবে অশান্তি-দুঃখ-কষ্ট আর সামাজিক অস্থিরতা।

প্রিয় পাঠক! আপনি যে মাঠে নামাজ পড়বেন ওই মাঠেই এমন অনেকে থাকবেন যাদের আপনি পছন্দ করেন না। ব্যক্তিগত শত্রুতা, দলীয় ও মাজহাবি বিদ্বেষের কারণে এত দিন আপনি যার ছায়াও মাড়াননি। আসুন! ঈদের এই আনন্দঘন দিনে তাকেই ভাই বলে বুকে জড়িয়ে নিই। কোলাকুলি করি পরম প্রেম নিয়ে। কোলাকুলির সময় কানের কাছে চুপটি করে বলুন, ‘ভাই!/এক আল্লাহর বান্দা মোরা,/কোনো ভোদাভেদ নাই।’

Share on

Tags

(2) Comments

Add Comment