কেন বিশেষ দূতদের পাকিস্তান সফর বাতিল করলেন ট্রাম্প

Posted on April 26, 2026   5.1K

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আকস্মিক সিদ্ধান্তে পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন তার দুই শীর্ষ প্রতিনিধি। মাত্র একদিন আগে এই সফরের ঘোষণা দিলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করার মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিল যে, আলোচনার পরবর্তী ধাপের জন্য যে ন্যূনতম শর্তগুলো প্রয়োজন ছিল, তা পূরণ করতে তেহরান ব্যর্থ হয়েছে। 

হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কোনো পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়। ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান মূলত ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের দেওয়া লক্ষ্মণরেখা বা ‌‌‘রেড লাইন’ অমান্য করারই একটি প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

গত দুই সপ্তাহ ধরে মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের কাছ থেকে দুটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ইতিবাচক সংকেতের অপেক্ষায় ছিলেন। প্রথমত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের কঠোর শর্তাবলি মেনে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এবং দ্বিতীয়ত, ইরানের শাসনব্যবস্থার মধ্যে ঠিক কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন সে সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা। দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনার পর গত চৌদ্দ দিনে তেহরানের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ আশা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা মার্কিন মানদণ্ড স্পর্শ করতে পারেনি। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে, ইরানের নেতৃত্ব এখন বহুমুখী সংকটে বিভক্ত এবং কোনো একটি টেকসই চুক্তিতে আসার মতো স্থিতিশীলতা তাদের মাঝে বর্তমানে অনুপস্থিত।

অথচ মাত্র একদিন আগেও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল বলে মনে হচ্ছিল। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত বুধবার সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, গত কয়েক দিনে ইরানি পক্ষের মধ্যে কিছুটা অগ্রগতির লক্ষণ দেখা গেছে। তার এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে আশার সঞ্চার করেছিল যে, হয়তো দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো বড় ধরনের সমঝোতা হতে চলেছে। কিন্তু পর্দার আড়ালে চলমান কূটনৈতিক যোগাযোগে শেষ পর্যন্ত এমন কিছু উঠে আসেনি যা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করতে পারে। লেভিটের ইতিবাচক বার্তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ট্রাম্পের এই সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার পর্যায়ক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ট্রাম্পের এই বাতিলের ঘোষণা এসেছে ঠিক এমন একসময়ে যখন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ইসলামাবাদ ত্যাগ করেছেন। আরাঘচি সেখানে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাব সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়েছিলেন। আরাঘচি পাকিস্তান ছাড়ার ঠিক এক ঘণ্টা পর ট্রাম্প তার প্রতিনিধিদের সফর বাতিলের নির্দেশ দেন। এতে বোঝা যায়, আরাঘচি ইসলামাবাদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে যে বার্তা পৌঁছাতে চেয়েছিলেন, তা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে পর্যাপ্ত বা গঠনমূলক মনে হয়নি। এই ঘটনাটি সরাসরি তেহরানকে একটি কঠোর বার্তা দিয়েছে যে, দায়সারা প্রস্তাব দিয়ে ট্রাম্পের দরবারে সুবিধা করা সম্ভব হবে না।

ট্রাম্প অবশ্য এই সফর বাতিলের পেছনে একটি ব্যবহারিক কারণও তুলে ধরেছেন। তার মতে, ১৮ ঘণ্টার সুদীর্ঘ বিমানযাত্রা পাড়ি দিয়ে পাকিস্তানে যাওয়া এবং সেখান থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন ছাড়া ফিরে আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তিনি একটি ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ বা ‘কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস’ সামনে এনেছেন যেখানে দীর্ঘ ভ্রমণের ধকলের চেয়ে আলোচনার ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই ছিল প্রবল। ট্রাম্পের ভাষায়, যখন সাফল্যের সম্ভাবনা অত্যন্ত নগণ্য, তখন রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং সময়ের অপচয় করার কোনো মানে হয় না। এই যুক্তি দিয়ে তিনি মূলত ইরানকে বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাদের প্রস্তাব মার্কিন প্রতিনিধিদের দীর্ঘ সফরের যোগ্য হয়ে ওঠেনি।

মার্কিন কর্মকর্তাদের প্রধান উদ্বেগের জায়গাটি এখন ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। তারা মনে করছেন, ইরানের বর্তমান শাসনের ভেতরে কট্টরপন্থী এবং মধ্যপন্থীদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। এই ক্ষমতার লড়াইয়ের কারণে তেহরান কোনো একটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে পৌঁছাতে পারছে না। ওয়াশিংটনের ধারণা, ইরানি কূটনীতিকরা আলোচনার টেবিলে যে প্রতিশ্রুতিই দিন না কেন, ঘরের ভেতরে বিরোধিতার কারণে তারা তা বাস্তবায়ন করতে পারছেন না। ট্রাম্প নিজেও তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন যে, ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে এখন ব্যাপক মারামারি এবং বিভ্রান্তি চলছে; এমনকি তারা নিজেরাও জানে না যে আসলে দেশ পরিচালনার দায়িত্বে কে আছেন।

ট্রাম্পের এই অনড় অবস্থানের মূল ভিত্তি হলো তার বিশ্বাস যে, এই মুহূর্তে সমস্ত সুবিধা বা ‘কার্ড’ আমেরিকার হাতে রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, ইরানের হাতে দর-কষাকষি করার মতো কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের কৌশল হলো প্রতিপক্ষকে চরম চাপে রেখে নিজের শর্ত মানতে বাধ্য করা। তিনি মনে করেন, ইরান এখন অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে এতটাই কোণঠাসা যে, শেষ পর্যন্ত তাদেরকেই নতি স্বীকার করে ওয়াশিংটনের টেবিলে ফিরে আসতে হবে। এই আধিপত্যবাদী মানসিকতা থেকেই তিনি বারবার বলছেন যে, এটি ইরানের সমস্যা, আমেরিকার নয় এবং তারাই চুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।

তবে ট্রাম্পের এই উদাসীনতা এবং কঠোর মনোভাবের বিপরীতে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে আছে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর। চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার অর্থ হলো যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক অস্থিরতা প্রলম্বিত হওয়া। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি, যা বিশ্বের তেল বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী, তা বন্ধ থাকা বিশ্ববাজারের জন্য বড় হুমকি। চুক্তি ছাড়া কীভাবে এই সংকটের সমাধান হবে এবং কীভাবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। শেষ পর্যন্ত এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা কেবল ইরান নয়, বরং সারা বিশ্বের জ্বালানি ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

Share on

Tags

(0) Comments

  • Nothing Found!

Add Comment